DON'T MISS
Home » Bangladesh » Bangladeshi Politics » যাঁরা প্রথম আলোর ভুল ধরেছেন, তাঁরাই বড় ভুল করেছেন

যাঁরা প্রথম আলোর ভুল ধরেছেন, তাঁরাই বড় ভুল করেছেন

আটক হওয়ার পাঁচ দিন পর প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান মুক্তি পেয়েছেন, সম্পাদক মতিউর রহমানকে উচ্চ আদালত আগাম জামিন দিয়েছেন, এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর। বাংলাদেশের মানুষের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিরাও এতে আনন্দিত।

জনগণ একদল ‘উৎকৃষ্ট’ প্রতিনিধি নির্বাচিত করে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, এটা গণতন্ত্র। আবার সেই দেশে জনগণের কথা বলার স্বাধীনতাও থাকতে হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ ও কষ্টের কথা গণমাধ্যম প্রকাশ করবে, এটাই স্বাভাবিক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলে রাষ্ট্র ভালো থাকে, জনগণ ভালো থাকে।

একটি ‘অসংগতি’ বা ‘ভুল’কে অপরাধীকরণের এই প্রক্রিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাংবাদিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ। 

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলেছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে দিনমজুর ও নিম্নবিত্তদের। তবে এটা নতুন কোনো সংবাদ নয়। একজন দিনমজুরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই খবরের ভিত্তিতে ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। এরপর কী হলো, তা দেশ-বিদেশে অনেকেরই জানা।

এ নিয়ে ‘ চিলে কান নিয়ে গেছে’ কিংবা ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করা হয়েছে বলে সরকারি মহলে শোরগোল ওঠে। মধ্যরাতে মামলা ও সাংবাদিক ধরপাকড়। ২০ ঘণ্টা তিনি কোথায় ছিলেন, কেউ জানেন না। ২০ ঘণ্টা পর তাঁকে হাজির করা হলো আদালতে, যেই দৃশ্য দেখে কেউ ভুল ভাবতে পারেন যে কোনো গুরুতর অপরাধে গ্রেপ্তার কাউকে আনা হয়েছে আদালতে। সেই সঙ্গে প্রথম আলোর সম্পাদকের নামে মধ্যরাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হলো। যদিও ফটোকার্ড নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, তা ১৭ মিনিটের মাথায় সেটি সংশোধনও করা হয়।

আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস আছে। ফটোকার্ডে একজন দিনমজুরের বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে সরকার ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠী যেভাবে শোরগোল তুলেছে, তা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চিন্তাও করা যায় না। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই কোনো সরকার এ কাজ করতে পারে। দেশের ও জনগণের স্বার্থে গণমাধ্যম সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়, ভুল পথে চললে সতর্ক করে দেয়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র খোঁজা খুবই অন্যায়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে দেশে বিদেশে সমালোচনার শেষ নেই। নেটিজনেরা মনে করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং ভিন্নমত দমনের জন্য। গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার জন্য।

জনগণের বৃহৎ স্বার্থেই এই আইন অবিলম্বে সংশোধন হওয়া প্রয়োজন।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। উদাহরণ হিসেবে যদি বলি, অস্ট্রেলিয়ায় জনগণের কাছে জবাবদিহি হলো সরকারের অবশ্যকর্তব্য। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ যদি কোনো বিষয়ে মতামত প্রকাশ করে সরকারের কাছে প্রতিকার চায়, অবিলম্বে সংসদীয় অধিবেশনে সেটা নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। আবার সরকারের ভুল হলে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা জনসমক্ষে এসে ক্ষমা চেয়ে থাকেন। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের মূল্যায়ন এভাবেই হয়ে থাকে।

আমাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য আছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস আছে। ফটোকার্ডে একজন দিনমজুরের বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে সরকার ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠী যেভাবে শোরগোল তুলেছে, তা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে চিন্তাও করা যায় না।

জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেই কোনো সরকার এ কাজ করতে পারে। দেশের ও জনগণের স্বার্থে গণমাধ্যম সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়, ভুল পথে চললে সতর্ক করে দেয়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র খোঁজা খুবই অন্যায়। গণমাধ্যম হিসেবে প্রথম আলো শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করছে, দেশের উন্নয়নে কাজ করছে।

আমরা মনে করি, যাঁরা ফটোকার্ডের বিষয়টিকে অতিরঞ্জন করে প্রচার করেছেন, তাঁরাও জানেন, এটা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে কোনো ভুল বা অন্যায় ছিল না। তারপরও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা কিংবা সাংবাদিককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া ভয় দেখানো ছাড়া কিছু নয়। 

সমাজের একটি বাস্তবতা বোঝাতে ফটোকার্ড প্রকাশ করে কিংবা এর সংশোধনী ছেপে প্রথম আলো কোনো ভুল বা অন্যায় করেনি। বিশ্বব্যাপী এটি সাংবাদিকতার রীতি। অস্ট্রেলিয়ার সরকারি পত্রিকা অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনের (এবিসি নিউজ) একটি সংশোধনী পাতাই রয়েছে আলাদা করে। সেখানে দেখা যায়, সরকারি অনুদানে পরিচালিত এই পত্রিকায় গত মাসে ‘স্থানীয় কাউন্সিলের নামে জরিমানা’, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের যুক্ততা’, ‘নাগরিকত্ব বাতিল’ ইত্যাদি ত্রুটিপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করার সংশোধনী দেওয়া রয়েছে। এ জন্য তাদের মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল ও প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামানের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন

আবার অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম সিডনি মর্নিং হেরাল্ডেও সংশোধনী পাতা রয়েছে। সেখানে খুন হওয়া এক শিশুকন্যার ছবি প্রকাশের মতো মারাত্মক ভুলেরও সংশোধনী করে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে।

যাঁরা প্রথম আলোর ফটোকার্ডের বিষয়টিকে অতিরঞ্জন করে প্রচার করেছেন, তাঁরাও জানেন, প্রথম আলো সাংবাদিকতার নীতিমালা লঙ্ঘন করেনি, পেশাদারত্ব থেকে সরে যায়নি। আসলে যাঁরা প্রথম আলোর ‘ভুল’ ধরেছেন, তাঁরাই মস্ত বড় ভুল করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*